পল্লবী প্রতিনিধি | বাংলাদেশ প্রতিদিন
প্রকাশিত: ৪ জুনে ২০২৬
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে তিন কক্ষের একটি ফ্ল্যাটের স্যাঁতসেঁতে ও চরম নোংরা পরিবেশের আবর্জনার স্তূপ থেকে ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা নূর জাহান বেগমের পচনধরা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাটি দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ, আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে এ ঘটনায় বৃদ্ধার উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত সন্তানদের ভূমিকা নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন উঠছে।
এই অমানবিক ঘটনার জেরে নূর জাহান বেগমের বড় ছেলে এবং সরকারের যুগ্ম সচিব আনিসুর রহমানকে তাঁর বর্তমান দায়িত্ব থেকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ওএসডি (সংযুক্ত) করেছে সরকার।
এমন এক চরম অস্বস্তিকর ও সমালোচনার মুখে এবার ঘটনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে পরিবারের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন নূর জাহান বেগমের ছোট ছেলে এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (CSE) বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কে এম আশিকুর রহমান। তিনি দাবি করেছেন, মায়ের মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের পরিবার সম্পর্কে নানা "মিথ্যা তথ্য" ছড়ানো হচ্ছে।
অধ্যাপক ড. আশিকুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, "মা মারা যাওয়ার পর আমরা এমনিতেই এক চরম মানসিক ট্রমার (Mental Trauma) মধ্যে আছি। এর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমাদের নিয়ে নানা ধরনের ভিত্তিহীন ও মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, যা দেখে আমরা মানসিকভাবে আরও বেশি ভেঙে পড়েছি।"
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মা মারা যাওয়ার পর থেকে অনেকেই ঢালাওভাবে বলছেন যে, ছেলেমেয়েরা মায়ের কোনো দেখভাল বা খোঁজখবর করেননি। এই বিষয়টি মোটেও সত্য নয়।
নিজের সাফাই গেয়ে আশিকুর রহমান জানান, ২০০৯ সালে তিনি মাকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন। পরবর্তীতে ২০১১-২০১২ সালে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে থাকাকালীন তাঁর শাশুড়ির বাসায় মাকে রেখেছিলেন। এরপর ২০১৩ সালে দেশে ফিরে আবার মাকে নিজের কাছে আনেন। মা মাঝেমধ্যে চাঁদপুরের মতলবে নানাবাড়িতে গিয়েও থাকতেন। এমনকি ২০২০ সালে করোনাকালের কঠিন সময়েও মায়ের করোনার উন্নত চিকিৎসা করিয়েছিলেন তিনি।
নূর জাহান বেগম যেভাবে এক চূড়ান্ত নোংরা ও পচা আবর্জনার পরিবেশে মারা গেলেন, তা অস্বাভাবিক কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক আশিকুর রহমান স্বীকার করে বলেন, "বিষয়টি কিছুটা অস্বাভাবিক, তা নিয়ে সমালোচনাও হতে পারে। তবে তা বলে আমাদের নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো কোনোভাবেই কাম্য নয়।"
এর আগে গত ৩১ মে রাজধানীর মিরপুর-১১ এলাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে নূর জাহান বেগমের পচনধরা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ফ্ল্যাটের ভেতর থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ালে প্রতিবেশীরা জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল করেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দরজা ভেঙে লাশটি উদ্ধার করে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ জানায়, তিন কক্ষের ওই ফ্ল্যাটের একটি কক্ষে থাকতেন নূর জাহান, অন্যটিতে তাঁর এক মেয়ে। আর বাকি কক্ষটি মূলত ব্যবহার করা হতো স্টোররুম হিসেবে। কিন্তু ফ্ল্যাটের মূল দরজা পেরোলেই চোখে পড়ে বিশাল আবর্জনার স্তূপ। শোবার ঘর থেকে শুরু করে রান্নাঘর—প্রায় পুরো বাসাজুড়েই বছরের পর বছর ধরে ছড়িয়ে ছিল ময়লা-আবর্জনা। এক চরম স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ ও তীব্র দুর্গন্ধে ভরে ছিল পুরো ফ্ল্যাটটি। তবে সবচেয়ে বেশি আবর্জনা জমেছিল নূর জাহানের নিজের কক্ষে, আর সেই নোংরা বিছানা থেকেই পরে তাঁর পচনধরা মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ঘটনাটি গভীরভাবে তদন্ত করছেন পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) শামছুর রহমান। তিনি ঘটনার ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, নূর জাহানের স্বামী মজিবুর রহমান অনেক আগেই মারা গেছেন। তাঁর মৃত্যুর পর দুই প্রতিষ্ঠিত ছেলে মায়ের কোনো খোঁজখবর না রাখায় নিরুপায় হয়ে মেয়েটির কাছেই থাকতেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে নূর জাহান বেগম বিভিন্ন বার্ধক্যজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী ছিলেন।
পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও জানান, সবশেষ মাকে তাঁর মেয়ে নড়াচড়া করতে দেখেছিলেন গত ঈদের আগের দিন, অর্থাৎ ২৭ মে। এরপর দীর্ঘ ৪ দিন মায়ের ঘর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না থাকায় এবং তীব্র দুর্গন্ধ বের হওয়ায় গত ৩১ মে একজন নার্স ডেকে আনা হয়। তখন নার্স পরীক্ষা করে বৃদ্ধার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
তদন্ত কর্মকর্তা এসআই শামছুর রহমান আক্ষেপ করে বলেন, "মায়ের প্রতি সন্তানদের চরম অবহেলা ও অযত্নের এক নির্মম চিত্র ছিল এটি। পৃথিবীর বুকে কোনো সন্তান যেন তাঁর বৃদ্ধ বাবা-মায়ের প্রতি এমন অমানবিক আচরণ না করেন।" উচ্চশিক্ষিত ও সমাজের শীর্ষ স্তরে থাকা সন্তানদের এমন চরম নৈতিক অবক্ষয়ের ঘটনায় পুরো মিরপুর এলাকায় এখনো স্তব্ধতা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।
আপনার মতামত জানান:
সমাজের উচ্চস্তরে থাকা সন্তানদের এমন আচরণ ও বৃদ্ধ মায়ের এই করুণ পরিণতিকে আপনি কীভাবে দেখছেন? আপনার মূল্যবান মতামত নিচে কমেন্ট করুন।
দেশের সামাজিক অবক্ষয়, আইন-আদালত, মানবাধিকার এবং রাজধানীর সব ব্রেকিং ও এক্সক্লুসিভ নিউজ সবার আগে বস্তুনিষ্ঠভাবে পড়তে নিয়মিত ভিজিট করুন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |